সঠিক দিন , মাস , বছর কোনোটাই মনে নেই | সম্ভবত ২০০৩ | কি কারণে আমি আরেকবার Denver শহরে বসবাস করা ঠিক করলাম সেই প্রসঙ্গ পরে একদিন হবে | Castlegate Apartments এ থাকাকালীন , আমার ব্যবসায়িক জীবনের প্রথম বরাত | তখনকার হিসেবে অনেক টাকার ব্যাপার | বয়েস কম ছিল | ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে দেখলাম, আমার একার পরিশ্রমেই কাজটা হয়ে যাবে মাস তিনেকের মধ্যে | প্রথম কিস্তির টাকা , client অগ্রিম দিয়ে দিয়েছে |
গেল মাথাটা ঘুরে | হোস্টেলে এক খানা বিড়ি তিন ভাগ করে খাওয়া অমিতাভ রায়, রাতারাতি বেশ মোটা একখানা ল্যাজ গজালো | চারিদিকে অনেক লোককে দেখে মনে হত - আহা কি আনন্দেই না আছে | রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি , দামি lexus , mercedez গাড়ি | আর আমাকে দেখ - Kemon একটা হতচ্ছাড়ার মত এক কামরার ফ্ল্যাটে তিন জন গুঁতোগুঁতি করে থাকি | ছোট্ট শিশুটার একটা খেলার মত বাগানও নেই | ঠিক করে ফেললাম - আর বিলম্ব নয় | হামারা ল্যাজ যথেষ্ট মোটা হ্যায় | একখানা বাড়ি কিনবো বাকি সবার মত | আরেকটা দামি গাড়িও কিনব|
আমেরিকাতে গাড়ি কেনার ব্যাপারে অনেকগুলো প্রচলিত প্রথা আছে | প্রথমত, একেবারে হাতিবাগানের ফুটপাথের দোকানে রকমারি হাবিজাবি জন্য যেমন কান কাটা হয়ে দর দস্তুর করতে হয় , এখানে সেটা করতে হয় গাড়ি কেনার সময় | দ্বিতীয়ত, এক বছর পুরোনো গাড়ি কেনাটাই বুদ্ধিমানের কাজ | খুচরো ঝামেলা গুলো থাকে না, গাড়ি অনেক মসৃন ভাবে চলে | এবং প্রথম বছরের মূল্যহ্রাসের অঙ্কটা নেহাত কম হয় না - সেটা নিজের ট্যাঁক থেকে বেরোয় না | অতএব , কোনো একদিন ফাঁক দেখে , এক বছর বয়স্ক একটি Lexus GS 300 , নিয়ে ঘরে ঢুকলাম | বেশ একটা কেউকেটা মনে হচ্ছিল নিজেকে | আশেপাশের দু চারজন, বাইরে রাখা গাড়িটার দিকে আড়চোখে দেখে চলে গেল | দেখ শালা; ভালো করে দেখ | চামড়া বাদামি হতে পারে , কিন্তু গাড়িটা কেমন হাঁকিয়েছি, ভালো করে দেখ !
এর পরপরেই, আমার ল্যাজের ব্যাসার্ধ যে এতটুকু কমেনি সেটাও তো বোঝাতে হবে | শুধু Lexus চড়ে বাঙালি পার্টি তে গেলে, বিশেষ কোন হনু হওয়াটা প্রমাণিত হয় না | বেশ কয়েকটা জায়গা চষে, শেষমেশ কিনেই ফেললাম একখানা প্রাসাদোপম বাড়ি |
বিরাট বাড়ি সে | পেছনে বিস্তৃত ডেক | তার পরে অনেক খানি কার্পেটের মতো ঘাসে মোড়া yard | তিনটে গাড়ি রাখার গ্যারেজ, খান চারেক শোবার ঘর | তিনটে বাথরুম | এলাহী খোলা রান্নাঘর | আমার ল্যাজের size যে কতটা, সেটা দেখানোর জন্য বহুবার বহু লোকের সমাগম | সেখানে সবই ছিল | শুধু ছিল না শান্তি |
যেদিন জানতে পারলাম আমার সাংসার অনেক দিন আগেই ভেঙে গেছে , বুঝলাম বাড়িটাই রয়েছে, সেখানে আমি নেই |
তবু অহংকার কি আর অত সহজে যায় ? ডিভোর্সের সময় মাননীয়া বিচারপতির কাছে আমি একটি বস্তুই রাখতে চেয়েছিলাম | Lexus গাড়িটা | উনি বোধহয় বুঝেছিলেন যে গাড়িটাকে আমি ভালোবাসি |
কিন্তু সে গাড়িও আমি রাখতে পারিনি | ২০০৯ সালে কপর্দকশূন্য হয়ে, একবেলা খেয়ে ধারে একটা মোটেলে থাকাকালীন উপায়ান্তর না দেখে জলের দরে বিক্রি করে দিলাম | কিছুদিনের জন্য হলেও শখের গাড়ি আমাকে প্রাণ দান করে দিয়ে গেল | এবং একটা শিক্ষাও দিয়ে গেল |
ল্যাজ বাদ দিয়ে মানুষ হলাম |
আমাকে একজন বলেছিলেন - আমার নাকি একটা "self made man " এর ego আছে | সেটা ভাঙতে পেরে তিনি উদ্বেলিত | নাঃ, সেটা ভাঙার ক্ষমতা খুব কম মানুষেরই আছে |
আজ আমি যতটা পারি সাইকেল চালাই| ভালো লাগে |