অনেক জমে আছে | মাথার মধ্যে খালি ঘুরপাক খায়; "আফসোস" নিয়ে কথা হচ্ছিল দু চারজন বন্ধুর সাথে |
আমার ক্ষেত্রে কয়েকটা অবশ্য বোম্বাই মার্কা মতিভ্রম | আর একই ভুল বারবার করাটা মূর্খামি | যাদের মুখোশ বারংবার খসে গেছে, তাদের কে প্রতিবারই "benefit of doubt " দেওয়াটাকে মূর্খামি ছাড়া অন্য কিছু বলা উচিত নয় |
কয়েকদিন আগে আমিতাভ দা (আমিতাভ রক্ষিত) কলকাতায় এসেছিলেন | দেখা হল; ভীষণ ভালো লাগল|
২০০৯ এর ডিসেম্বর |
একটা পুরোনো বাড়ি কিনেছি - পেল্লায় সাইজের | মূলত বাড়ির পেছনে ও সামনে বেশ অনেকটা জায়গা আছে দেখে | খেলার অনেকটা জায়গা পাওয়া যাবে | আর কাছেই স্কুল, পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ | বাড়িটার হাল খুবই খারাপ | তবে সস্তা | আমার একার জন্য অবশ্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেকটাই অতিরিক্ত | কিন্তু সময় কেটে যাবে সব ঠিক ঠাক করতে | নিজের হাতে টুকটাক কাজ করতে আমার ভালোই লাগে | গ্যারাজের মধ্যে সেকেন্ড হ্যান্ড বেশ কিছু যন্ত্রপাতিও নিয়ে এলাম |
বোধহয় ২২ শে ডিসেম্বর | আমার বড় সন্তানের জন্মদিন সামনে ; তার ইচ্ছে অনুযায়ী কয়েকটি বাচ্চা ছেলে আমার বাড়িতে একটা রাত্রি থাকবে, খাওয়া দাওয়া করবে | Safeway তে বাজার করছি তার জন্য | বেদম কাশি শুরু হয়ে গেল | তাড়াতাড়ি সব নিয়ে ফিরে এলাম | কাশি টা থেকে থেকেই ভোগাচ্ছে | অল্প বিস্তর রান্না , আর বাকিটা "heat and eat "|
হয়ে যাওয়ার পর জানলাম ওদের মধ্যে একটি ছেলের বাড়িতে খুবই অভাব চলছে | তার জন্য বেশ অনেকটা ছাঁদা বেঁধে দিলাম | বড় শোয়ার ঘরটা ছেড়ে দিলাম ওদের খুনসুটির জন্য | তারপর হাতে ফোন নিয়ে, সিগারেট ধরিয়ে , রোজকার মত বাড়িতে ফোন করলাম | বাড়ির ভেতর ধূমপান করা যাবে না| বাইরে হিড়হিরে ঠান্ডা | তাই আপোষ - গ্যারাজের সিঁড়ি | ঠান্ডা অপেক্ষাকৃত কম | কাশিটা তখনও থেকে থেকে জানান দিচ্ছে | মায়ের সাথে কথা বললাম | অনেকদিন ধরেই বলছি, তোমরা একবারটি ঘুরে যাও| রূপ কে নিয়ে একাই থাকি | ও যখন ওর মা এর কাছে যায় , আমার সময় কাটতে চায় না | সেদিন একটু অভিমান করেই বললাম - থাক, তোমাদের আর আসতে হবে না |
পরের দিন বাচ্চাদের মা বাবারা এক এক করে নিয়ে গেলেন | সেদিনটা আমি বাড়ি থেকেই কাজ করলাম | কাশিটা থামছে না | বিকেল গড়িয়ে রাত হল | খাওয়া দাওয়া সেরে, রূপ কে ঘুম পাড়িয়ে , একটা বই নিয়ে শুতে গেলাম | কাশির দমকে কিছুতেই ঘুমোতে আর পারি না | শুলেই মনে হচ্ছে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে | পুরো রাতটা কেটে গেল দাঁড়িয়ে আর পায়চারি করে | হাতের কাছে cough syrup , গরম জলের ভাপ ইত্যাদির কোনোটাই বিশেষ কাজে দিলো না |
২৪শে ডিসেম্বর | Christmas Eve | রূপ কে স্কুলে পাঠানোর পর, তৈরী হয়ে গাড়ি বার করলাম | একরকম জোর করেই অফিস গেলাম | বেশ ঠান্ডা| অল্প বিস্তর বরফ জমে আছে আগের দিনের তুষারপাতের ফলে | অফিসের পার্কিং লট ফাঁকা | বড়দিনের লম্বা ছুটিতে অধিকাংশ লোকই নেই | হেঁটে নিজের ঘরে পৌঁছতে দম বেরিয়ে গেল | খালি মনে হচ্ছে বদহজম হয়ে তলপেট থেকে গলা অবধি ফেঁপে আছে |
চেয়ার এ বসে খানিক্ষন ঝিমিয়ে নিলাম | চারিদিক শুনশান | কোনো মিটিং নেই | সাধারণত ডেস্কের ফোনটা গড়ে পাঁচ মিনিট পরপর বাজে - বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন দাবি | আজ একেবারে শান্ত | ঘুমিয়েই পড়েছিলাম | সেল ফোনের শব্দে চটকা ভাঙল |
মায়ের গলা - আমরা পরশু বেরোচ্ছি | সাতাশ তারিখ সন্ধ্যাবেলায় পৌঁছে যাব | আমার ঘড়িতে তখন দুপুর দেড়টা | বিশেষ কিছুই করার নেই দেখে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম | বাড়ি ফিরে অল্প ডাল ভাত করে রাখব | মা বাবা এলে যাতে অসুবিধে না হয় |
২৪শে ডিসেম্বর, প্রায় মধ্যরাত | দাঁড়িয়ে থাকলে তাও নিশ্বাস নিতে পারছি | তবে ঠ্যাঙে ব্যাথা হয়ে গেছে | রূপ ঘুমিয়ে পড়েছে | থেকে থেকেই কাশি ; হরেকরকম antacid খাওয়ার পরও ফেঁপে থাকাটা যাচ্ছে না | ভোর রাত্রে আর থাকতে পারলাম না | রূপের মা কে বাধ্য হয়েই ফোন করে জানালাম যে আমাকে ইমার্জেন্সি তে যেতে হবে, ওকে নামিয়ে দিয়ে | বেচারা ছোট্ট ছেলেটাকে আধঘুম থেকে তুলতে মায়া লাগছিল | কিন্তু উপায় নেই | হাড় হীম করা ঠান্ডায়, North Suburban Medical Center এর Emergency তে পৌঁছে, মনে একটু বল এল | এবার যাই হোক না কেন , ডাক্তার বাবুরা আছেন | একটি Chest X-Ray করার পর, অল্পবয়স্ক ডাক্তারটি বিনা দ্বিধায় জানিয়ে দিল - Pneumonia | Augmentin নামক anti-biotic | চুপচাপ বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ুন | একদম বিশ্রাম |
ওষুধগুলো নিয়ে নিয়ে অগত্যা বাড়ি ফিরে এলাম | বিশ্রাম বললেই তো আর বিশ্রাম হয় না | মা বাবা আসছেন | একটু অন্তত পরিষ্কার করে রাখতে হবে সব | ধারণা ছিল - ওষুধ পেটে পড়বে, আর আমিও আগের মত দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেব | যাই হোক , যতটা পারলাম বিশ্রাম নিলাম | কিন্তু না কমল কাশি , না কমল নিঃশ্বাসের কষ্ট |
আরও একটি বিনিদ্র রাত | ওষুধে বিশেষ কাজ হয়েছে বলে মনে হল না | রাত বাড়ার সাথে সাথে অস্বস্তিও যেন বেড়েই চলল | ভোরের আলো দেখলাম - তাকে অবশ্য আলো আর বলা যায় না | এই সময়টাতে সূর্য পূব দিকে সামান্য উঁকি মেরে দিগন্তের গা ঘেঁষেই আবার গায়েব হয়ে যায় পাহাড়ের পেছনে |
দিনের বেলাটা কখনো সোফায় আধশোয়া হয়ে, নয়ত ভ্যাবলার মতো শুনশান রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেল | আমার ভাইয়ের ঘনিষ্ট বন্ধু , অভিষেক ও তার স্ত্রী অজন্তা কে জানিয়ে রেখেছিলাম | যতদূর মনে পরে বড়দিনের মাধ্যাহ্নভোজটা ওরাই নিয়ে এসেছিল | সন্ধ্যাবেলায় বিমানবন্দর যেতে হবে ; রূপ কে জানাইনি | Surprise থাকবে বলে | শরীর দুর্বল লাগছে ঠিকই , দমবন্ধ ভাবটা একটু হলেও কমেছে | রূপকে তুলে নিয়ে , বেশ খানিকটা সময় থাকতেই পৌঁছে গেলাম Denver International Airport | এক সময় নাকে দড়ি বেঁধে দেশের চার কোন দৌড়েছি চাকরির খাতিরে এই গেট গুলো দিয়েই | এখানকার প্রায় প্রতিটি কোনাই আমার পরিচিত | রূপকে বলেছি আমার এক বিশেষ বন্ধু আসছে - মিথ্যে বলিনি | সামান্য "ইতি গজ " |
বাবা মা দের বেরোতে সময় লাগবে | একরাশ ক্লান্তি নিয়ে প্রতিক্ষালয়ের একটা চেয়ার দেখে বসলাম |
এরপর মিনিট কয়েক ধরে যে ঘটনাটা ঘটল , তার জন্যই এতো পায়তারা | চোখের কোন থেকে শুরু হল একটা কালচে পর্দা নামা | মাথাটা মনে হল যেন এই ঝলমলে পরিবেশের ভেতর ভেসে উঠেছে | বুকে ভয়ঙ্কর চাপ | কেউ যেন একটা মস্ত পাথর আমার বুক আর গলার মাঝখানে রেখে দিয়েছে | আমি তাকে সরাতে পারছি না | মাথাটা এলিয়ে গেল চেয়ার এর পেছনে |
নানান শব্দ ভেসে আসছে | ছেঁড়া টুকরো কথা , কখনো হাসি | রূপের গলা শুনলাম যেন | অধৈর্য হয়ে পড়ছে - আর কতক্ষন বাবা ? আমি বলছি - আরও অনেকক্ষন | এখনো সময় আসেনি | আসতে পারে না | আমাকে বাঁচতেই হবে | তোর জন্যেই বাঁচতে হবে | তোকে মানুষ করতে হবে; অন্ধ সন্তানপ্রেম - সে যে অনেক বড় | তার মোহ, তার দাবি, তার দায়িত্ব - বাকি আর কিছুর কোন প্রয়োজন নেই | তাই বাঁচতে আমাকে হবেই | সর্ব শক্তি দিয়ে সেই দানবাকার পাথরটাকে সরাতে হবে |
সরে গেল সেই পাথর | মা বাবাকে দেখে তখনকার ছোট্ট রূপ উচ্ছসিত | বোধহয় তার পরের দিন আমি হসপিটালে ভর্তি হই | শ্বাসকষ্ট | কাশি | Pneumonia তখন ফুসফুসের পুরোটাই দখল করে নিয়েছে | আর হৃদযন্ত্রের একটা ধারকে দিয়েছে বরাবরের মতো বারোটা বাজিয়ে | ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন - আচ্ছা আপনার কখনো হার্ট attack হয়েছে কি? পাশে বাবা এবং মা বসে | আমি বললাম - হয়ে থাকলেও আমার জানা নেই | মিথ্যে বললাম | ডাক্তার মুচকি হাসলেন |
তারপর? একসময় যারা খুব কাছের লোক ছিল তারা অবশ্য অনেককাল আগেই সম্পর্ক রাখা বন্ধ করে দিয়েছে | ঝুম্পু বোধহয় সব ফেলে প্লেন এ উঠে একদিন পরেই এসে গেছিল | একমাত্র এই অমিতাভদা , রথীন দা এবং মিরা দি , রুচিরা এবং অরবিন্দ দা , এবং সেই অভিষেক আর অজন্তা | মাঝখানে দুতিনবার রাজা এবং রোমি এসেছিল খোঁজখবর নিতে | আমিতাভ দা , প্রায় দিনই একবার ঢুঁ মেরে যেতেন | বাজার করে দেওয়া থেকে ওষুধ , ড্রাইভ করে নিয়ে যাওয়া | যাই হোক , এনারা আমার চরম দুঃসময়ে পাশে থেকেছেন | অমিতাভদা এবং আমি - দুজনেই divorcee - ম্লেচ্ছ | তাই বোধহয় বন্ধুত্বটা পোক্ত হয়েছে | সেই সময়ের দু তিন মাস , এক অশীতিপর বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা, তাদের জোয়ান সন্তানকে আরেকবার শুধু জীবনদান দিয়েই ক্ষান্ত হননি | সেই অপদার্থ সন্তানের সন্তানকে নিয়ম করে খাওয়ানো, পরানো, ভয়াবহ ঠান্ডার মধ্যে হেঁটে তাকে স্কুলে দিয়ে আসা নিয়ে আসা, সবই করেছেন |
শুধু সেই সময়তে নয় | আমি কলকাতায় এবং দুর্গাপুরে থাকাকালীনও | এখন অবশ্য সেসব মনে থাকার কথা নয় | জানি এসব আবোল তাবোল sentimental বকবকানি | শিক্ষা পেলাম অনেকটাই - কিছুটা হলেও মানুষ চিনতে শিখলাম | অকৃতজ্ঞ আমি কোনোদিনও ছিলাম বলে মনে হয় না | আজও নই |
মাঝে কানে এসেছিল , আমার মা ও বাবা কে নিয়ে বেশ অনেকেই অনেক কুকথা বলেছেন | ঠিকই করেছেন | বিষধর সাপের চেহারাগুলো কেমন হয় চিনতে পেরেছি - বিরাট পাওনা |
আমার ক্ষেত্রে কয়েকটা অবশ্য বোম্বাই মার্কা মতিভ্রম | আর একই ভুল বারবার করাটা মূর্খামি | যাদের মুখোশ বারংবার খসে গেছে, তাদের কে প্রতিবারই "benefit of doubt " দেওয়াটাকে মূর্খামি ছাড়া অন্য কিছু বলা উচিত নয় |
কয়েকদিন আগে আমিতাভ দা (আমিতাভ রক্ষিত) কলকাতায় এসেছিলেন | দেখা হল; ভীষণ ভালো লাগল|
২০০৯ এর ডিসেম্বর |
একটা পুরোনো বাড়ি কিনেছি - পেল্লায় সাইজের | মূলত বাড়ির পেছনে ও সামনে বেশ অনেকটা জায়গা আছে দেখে | খেলার অনেকটা জায়গা পাওয়া যাবে | আর কাছেই স্কুল, পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ | বাড়িটার হাল খুবই খারাপ | তবে সস্তা | আমার একার জন্য অবশ্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেকটাই অতিরিক্ত | কিন্তু সময় কেটে যাবে সব ঠিক ঠাক করতে | নিজের হাতে টুকটাক কাজ করতে আমার ভালোই লাগে | গ্যারাজের মধ্যে সেকেন্ড হ্যান্ড বেশ কিছু যন্ত্রপাতিও নিয়ে এলাম |
বোধহয় ২২ শে ডিসেম্বর | আমার বড় সন্তানের জন্মদিন সামনে ; তার ইচ্ছে অনুযায়ী কয়েকটি বাচ্চা ছেলে আমার বাড়িতে একটা রাত্রি থাকবে, খাওয়া দাওয়া করবে | Safeway তে বাজার করছি তার জন্য | বেদম কাশি শুরু হয়ে গেল | তাড়াতাড়ি সব নিয়ে ফিরে এলাম | কাশি টা থেকে থেকেই ভোগাচ্ছে | অল্প বিস্তর রান্না , আর বাকিটা "heat and eat "|
হয়ে যাওয়ার পর জানলাম ওদের মধ্যে একটি ছেলের বাড়িতে খুবই অভাব চলছে | তার জন্য বেশ অনেকটা ছাঁদা বেঁধে দিলাম | বড় শোয়ার ঘরটা ছেড়ে দিলাম ওদের খুনসুটির জন্য | তারপর হাতে ফোন নিয়ে, সিগারেট ধরিয়ে , রোজকার মত বাড়িতে ফোন করলাম | বাড়ির ভেতর ধূমপান করা যাবে না| বাইরে হিড়হিরে ঠান্ডা | তাই আপোষ - গ্যারাজের সিঁড়ি | ঠান্ডা অপেক্ষাকৃত কম | কাশিটা তখনও থেকে থেকে জানান দিচ্ছে | মায়ের সাথে কথা বললাম | অনেকদিন ধরেই বলছি, তোমরা একবারটি ঘুরে যাও| রূপ কে নিয়ে একাই থাকি | ও যখন ওর মা এর কাছে যায় , আমার সময় কাটতে চায় না | সেদিন একটু অভিমান করেই বললাম - থাক, তোমাদের আর আসতে হবে না |
পরের দিন বাচ্চাদের মা বাবারা এক এক করে নিয়ে গেলেন | সেদিনটা আমি বাড়ি থেকেই কাজ করলাম | কাশিটা থামছে না | বিকেল গড়িয়ে রাত হল | খাওয়া দাওয়া সেরে, রূপ কে ঘুম পাড়িয়ে , একটা বই নিয়ে শুতে গেলাম | কাশির দমকে কিছুতেই ঘুমোতে আর পারি না | শুলেই মনে হচ্ছে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে | পুরো রাতটা কেটে গেল দাঁড়িয়ে আর পায়চারি করে | হাতের কাছে cough syrup , গরম জলের ভাপ ইত্যাদির কোনোটাই বিশেষ কাজে দিলো না |
২৪শে ডিসেম্বর | Christmas Eve | রূপ কে স্কুলে পাঠানোর পর, তৈরী হয়ে গাড়ি বার করলাম | একরকম জোর করেই অফিস গেলাম | বেশ ঠান্ডা| অল্প বিস্তর বরফ জমে আছে আগের দিনের তুষারপাতের ফলে | অফিসের পার্কিং লট ফাঁকা | বড়দিনের লম্বা ছুটিতে অধিকাংশ লোকই নেই | হেঁটে নিজের ঘরে পৌঁছতে দম বেরিয়ে গেল | খালি মনে হচ্ছে বদহজম হয়ে তলপেট থেকে গলা অবধি ফেঁপে আছে |
চেয়ার এ বসে খানিক্ষন ঝিমিয়ে নিলাম | চারিদিক শুনশান | কোনো মিটিং নেই | সাধারণত ডেস্কের ফোনটা গড়ে পাঁচ মিনিট পরপর বাজে - বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন দাবি | আজ একেবারে শান্ত | ঘুমিয়েই পড়েছিলাম | সেল ফোনের শব্দে চটকা ভাঙল |
মায়ের গলা - আমরা পরশু বেরোচ্ছি | সাতাশ তারিখ সন্ধ্যাবেলায় পৌঁছে যাব | আমার ঘড়িতে তখন দুপুর দেড়টা | বিশেষ কিছুই করার নেই দেখে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম | বাড়ি ফিরে অল্প ডাল ভাত করে রাখব | মা বাবা এলে যাতে অসুবিধে না হয় |
২৪শে ডিসেম্বর, প্রায় মধ্যরাত | দাঁড়িয়ে থাকলে তাও নিশ্বাস নিতে পারছি | তবে ঠ্যাঙে ব্যাথা হয়ে গেছে | রূপ ঘুমিয়ে পড়েছে | থেকে থেকেই কাশি ; হরেকরকম antacid খাওয়ার পরও ফেঁপে থাকাটা যাচ্ছে না | ভোর রাত্রে আর থাকতে পারলাম না | রূপের মা কে বাধ্য হয়েই ফোন করে জানালাম যে আমাকে ইমার্জেন্সি তে যেতে হবে, ওকে নামিয়ে দিয়ে | বেচারা ছোট্ট ছেলেটাকে আধঘুম থেকে তুলতে মায়া লাগছিল | কিন্তু উপায় নেই | হাড় হীম করা ঠান্ডায়, North Suburban Medical Center এর Emergency তে পৌঁছে, মনে একটু বল এল | এবার যাই হোক না কেন , ডাক্তার বাবুরা আছেন | একটি Chest X-Ray করার পর, অল্পবয়স্ক ডাক্তারটি বিনা দ্বিধায় জানিয়ে দিল - Pneumonia | Augmentin নামক anti-biotic | চুপচাপ বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ুন | একদম বিশ্রাম |
ওষুধগুলো নিয়ে নিয়ে অগত্যা বাড়ি ফিরে এলাম | বিশ্রাম বললেই তো আর বিশ্রাম হয় না | মা বাবা আসছেন | একটু অন্তত পরিষ্কার করে রাখতে হবে সব | ধারণা ছিল - ওষুধ পেটে পড়বে, আর আমিও আগের মত দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেব | যাই হোক , যতটা পারলাম বিশ্রাম নিলাম | কিন্তু না কমল কাশি , না কমল নিঃশ্বাসের কষ্ট |
আরও একটি বিনিদ্র রাত | ওষুধে বিশেষ কাজ হয়েছে বলে মনে হল না | রাত বাড়ার সাথে সাথে অস্বস্তিও যেন বেড়েই চলল | ভোরের আলো দেখলাম - তাকে অবশ্য আলো আর বলা যায় না | এই সময়টাতে সূর্য পূব দিকে সামান্য উঁকি মেরে দিগন্তের গা ঘেঁষেই আবার গায়েব হয়ে যায় পাহাড়ের পেছনে |
দিনের বেলাটা কখনো সোফায় আধশোয়া হয়ে, নয়ত ভ্যাবলার মতো শুনশান রাস্তার দিকে তাকিয়ে থেকে কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেল | আমার ভাইয়ের ঘনিষ্ট বন্ধু , অভিষেক ও তার স্ত্রী অজন্তা কে জানিয়ে রেখেছিলাম | যতদূর মনে পরে বড়দিনের মাধ্যাহ্নভোজটা ওরাই নিয়ে এসেছিল | সন্ধ্যাবেলায় বিমানবন্দর যেতে হবে ; রূপ কে জানাইনি | Surprise থাকবে বলে | শরীর দুর্বল লাগছে ঠিকই , দমবন্ধ ভাবটা একটু হলেও কমেছে | রূপকে তুলে নিয়ে , বেশ খানিকটা সময় থাকতেই পৌঁছে গেলাম Denver International Airport | এক সময় নাকে দড়ি বেঁধে দেশের চার কোন দৌড়েছি চাকরির খাতিরে এই গেট গুলো দিয়েই | এখানকার প্রায় প্রতিটি কোনাই আমার পরিচিত | রূপকে বলেছি আমার এক বিশেষ বন্ধু আসছে - মিথ্যে বলিনি | সামান্য "ইতি গজ " |
বাবা মা দের বেরোতে সময় লাগবে | একরাশ ক্লান্তি নিয়ে প্রতিক্ষালয়ের একটা চেয়ার দেখে বসলাম |
এরপর মিনিট কয়েক ধরে যে ঘটনাটা ঘটল , তার জন্যই এতো পায়তারা | চোখের কোন থেকে শুরু হল একটা কালচে পর্দা নামা | মাথাটা মনে হল যেন এই ঝলমলে পরিবেশের ভেতর ভেসে উঠেছে | বুকে ভয়ঙ্কর চাপ | কেউ যেন একটা মস্ত পাথর আমার বুক আর গলার মাঝখানে রেখে দিয়েছে | আমি তাকে সরাতে পারছি না | মাথাটা এলিয়ে গেল চেয়ার এর পেছনে |
নানান শব্দ ভেসে আসছে | ছেঁড়া টুকরো কথা , কখনো হাসি | রূপের গলা শুনলাম যেন | অধৈর্য হয়ে পড়ছে - আর কতক্ষন বাবা ? আমি বলছি - আরও অনেকক্ষন | এখনো সময় আসেনি | আসতে পারে না | আমাকে বাঁচতেই হবে | তোর জন্যেই বাঁচতে হবে | তোকে মানুষ করতে হবে; অন্ধ সন্তানপ্রেম - সে যে অনেক বড় | তার মোহ, তার দাবি, তার দায়িত্ব - বাকি আর কিছুর কোন প্রয়োজন নেই | তাই বাঁচতে আমাকে হবেই | সর্ব শক্তি দিয়ে সেই দানবাকার পাথরটাকে সরাতে হবে |
সরে গেল সেই পাথর | মা বাবাকে দেখে তখনকার ছোট্ট রূপ উচ্ছসিত | বোধহয় তার পরের দিন আমি হসপিটালে ভর্তি হই | শ্বাসকষ্ট | কাশি | Pneumonia তখন ফুসফুসের পুরোটাই দখল করে নিয়েছে | আর হৃদযন্ত্রের একটা ধারকে দিয়েছে বরাবরের মতো বারোটা বাজিয়ে | ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন - আচ্ছা আপনার কখনো হার্ট attack হয়েছে কি? পাশে বাবা এবং মা বসে | আমি বললাম - হয়ে থাকলেও আমার জানা নেই | মিথ্যে বললাম | ডাক্তার মুচকি হাসলেন |
তারপর? একসময় যারা খুব কাছের লোক ছিল তারা অবশ্য অনেককাল আগেই সম্পর্ক রাখা বন্ধ করে দিয়েছে | ঝুম্পু বোধহয় সব ফেলে প্লেন এ উঠে একদিন পরেই এসে গেছিল | একমাত্র এই অমিতাভদা , রথীন দা এবং মিরা দি , রুচিরা এবং অরবিন্দ দা , এবং সেই অভিষেক আর অজন্তা | মাঝখানে দুতিনবার রাজা এবং রোমি এসেছিল খোঁজখবর নিতে | আমিতাভ দা , প্রায় দিনই একবার ঢুঁ মেরে যেতেন | বাজার করে দেওয়া থেকে ওষুধ , ড্রাইভ করে নিয়ে যাওয়া | যাই হোক , এনারা আমার চরম দুঃসময়ে পাশে থেকেছেন | অমিতাভদা এবং আমি - দুজনেই divorcee - ম্লেচ্ছ | তাই বোধহয় বন্ধুত্বটা পোক্ত হয়েছে | সেই সময়ের দু তিন মাস , এক অশীতিপর বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা, তাদের জোয়ান সন্তানকে আরেকবার শুধু জীবনদান দিয়েই ক্ষান্ত হননি | সেই অপদার্থ সন্তানের সন্তানকে নিয়ম করে খাওয়ানো, পরানো, ভয়াবহ ঠান্ডার মধ্যে হেঁটে তাকে স্কুলে দিয়ে আসা নিয়ে আসা, সবই করেছেন |
শুধু সেই সময়তে নয় | আমি কলকাতায় এবং দুর্গাপুরে থাকাকালীনও | এখন অবশ্য সেসব মনে থাকার কথা নয় | জানি এসব আবোল তাবোল sentimental বকবকানি | শিক্ষা পেলাম অনেকটাই - কিছুটা হলেও মানুষ চিনতে শিখলাম | অকৃতজ্ঞ আমি কোনোদিনও ছিলাম বলে মনে হয় না | আজও নই |
মাঝে কানে এসেছিল , আমার মা ও বাবা কে নিয়ে বেশ অনেকেই অনেক কুকথা বলেছেন | ঠিকই করেছেন | বিষধর সাপের চেহারাগুলো কেমন হয় চিনতে পেরেছি - বিরাট পাওনা |